দুটো মিনিট আপনার কাছে সময় থাকলে অনুরোধ জানালাম পড়তে এটি! মেয়েরা অবশ্যই পড়বেন

মেয়ের বয়স তো পঁচিশ পেরিয়ে গেল ! বিয়ে দেবে কবে ! লোকে যে মন্দ বলবে! আমার মেয়ে , যখন খুশী বিয়ে দেবো । কে কি বলছে , তাতে আমার কি ! আগে বলতে মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ালেই বিয়েটা দেবে। তা দু বছর তো হয়ে গেল , চাকরি করছে ও । এখনও বিয়ে দেবার নামটি করছ না। ব্যাপার কি , বল তো ! ”ব্যাপার আবার কি ! পঁচিশ একটা বয়স নাকি ! আরও দু বছর যাক , তারপর ভাবা যাবে । লোকে কিন্তু ভাববে মেয়ের রোজগারে বসে বসে খাবে বলেই এখনও বিয়ে দিচ্ছ না ওর । শালা লোকের মুখে আমি ইয়ে করে দিই ! আমার মেয়ের বিয়ে আমি কখন দেবো , এ নিয়ে লোকের কিসের মাথা ব্যথা ! ধুর ! তোমার মত গোঁয়ার লোককে কিছু বলাই ভুল হয়েছে আমার। যা খুশী তাই কর। ” রেগে গিয়ে চলে গেলেন বীথি । অঞ্জন সেদিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন বিয়ে বিয়ে করে পাগল হয়ে উঠছে একেবারে ! বিয়ে দিলেই যে মেয়ে অন্য কারো হয়ে যাবে , সে হুঁশ নেই। কে আছে আমাদের এই মেয়ে ছাড়া ! কি করে থাকব আমরা ওকে ছাড়া ! আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে হাসপাতালে তোয়ালে জড়ানো পুতুলটাকে কোলে তুলে দিয়েছিল নার্স মেয়েটা । সেই নরম পুতুলটাকে বুকে জড়িয়ে মনে হয়েছিল এই তো অঞ্জন আর বীথির প্রাণ ভোমরা । বিয়ের পাঁচ বছর পরে , যখন বাবা মা হওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন তারা , তখনই তাদের শূন্য জীবন কানায় কানায় ভরিয়ে দিতেই অঙ্কনা এসেছিল তাদের দুজনের মাঝে। ধীরে ধীরে অঙ্কনা যত বড় হয়ে উঠছিল , ততই ভয়টা জাঁকিয়ে বসছিল অঞ্জনের মনে। এই মেয়েটাকে একদিন অন্যের হাতে দিয়ে দিতে হবে। আর মেয়েটা তাদের একার থাকবে না। ভাবতেই বিদ্রোহ করে মন । যতদিন আটকানো যায় বিয়েটা , ততদিনই মঙ্গল। বীথির মাথায় ব্যাপারটা ঢোকে না মোটেই !কিন্তু বিপদটা যে কোন দিক দিয়ে আসছে , কল্পনাও করতে পারেন নি অঞ্জন। এক বিকেলে অফিস ফেরত একটা ছেলেকে নিয়ে এল অঙ্কনা।ওর অফিসেই কাজ করে নাকি ছেলেটা । বেশ দেখতে ছেলেটাকে । কথাবার্তাও সুন্দর,। ভালো লাগছিল ছেলেটাকে । দিব্যি আড্ডা জমে উঠেছিলো , ফুরফুরে হয়ে উঠেছিলো মন। কিন্তু ছেলেটা চলে যাবার পরেই অঙ্কনা বলে বসল ,

” বাবা ! একটা কথা বলার আছে তোমাদের । কিঞ্জলকে আমি ভালোবাসি , ওকেই বিয়ে করতে চাই , যদি তোমাদের আপত্তি না থাকে। এই কারণেই আজ কিঞ্জলকে বাড়ি নিয়ে এসেছি আমি। এখন তোমরা বল , তোমাদের মত কি । বীথি আনন্দে গদগদ হয়ে বলল  তো খুব ভালো কথা ! ছেলেটাকে ভারি পছন্দ হয়েছে আমার। ” বীথির আদিখ্যেতায় গা জ্বলে যাচ্ছিলো অঞ্জনের। তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন , ওই ছেলেকে পছন্দ হওয়ার কি আছে ! কি আছে ওর মধ্যে ! ছোকরা হ্যা হ্যা করে হাসতে পারে শুধু। বোকার হদ্দ একটা । মানে দেখলেই কেমন বোকা বোকা মনে হয়। এই ছেলের সঙ্গে অঙ্কনাকে মানাবে না একেবারেই । ”  বাবা ! আমি ভালোবাসি ওকে ! এভাবে কেন বলছ ? ”কাঁদো কাঁদো গলায় বলল অঙ্কনা । ” চুপ ! ভালোবাসা ! সেটা আবার কি ! ওই ছেলের সঙ্গে বিয়ে হবে না তোমার , ব্যস ! ” রেগে গিয়ে চলে গেল অঙ্কনা। বীথি বলল ,  কি শুরু করেছ তুমি ! তুমি বললেই অঙ্কনা শুনবে ! ও কি আর ছোটটি আছে ! মেয়ে পালিয়ে বিয়ে করুক , এটাই কি চাও তুমি ! আর ছেলেটার মধ্যে কি খারাপ দেখলে তুমি ! দিব্যি ভালো ছেলেটাকে মেনে নিচ্ছ না কেন ? ” না না ! এখন অঙ্কনার বিয়ে নিয়ে ভাবছিই না আমি ! ছেলে ভালো হোক কি মন্দ , এখন বিয়ে হবে না , ব্যস !  কি ব্যাপার তোমার , বল দেখি ! কেন অঙ্কনার বিয়ের কথা উঠলেই এড়িয়ে যেতে চাও তুমি ! সন্দেহের দৃষ্টি বীথির চোখে । দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে , তাই নিজেকে আড়াল করতে রেগে উঠলেন অঞ্জন। ব্যাপার আবার কি ! এখন বিয়ে দেবো না মেয়ের , ব্যস ! ”

অঞ্জনের মেজাজকে পাত্তা না দিয়ে বীথি বলল তুমি কি মেয়েকে কাছছাড়া করতে ভয় পাচ্ছ ? ছি ! মেয়ের মা বাবাদের কি এতোটা স্বার্থপর হলে মানায় !ধরা পড়ে গেছেন অঞ্জন। কিছুক্ষণ মুখ চুন করে বসে রইলেন। তারপর সব হারানোর গলায় বলে উঠলেন  কেন আমাদের মেয়েকে অন্য কোথাও যেতে দেবো ! কেন বীথি ! বল ! এটাই যে নিয়ম গো ! কিন্তু মেয়ের বিয়ে দিলেই সে তোমার কাছছাড়া হয়ে যাবে , এমন ভাবনাও ভুল কিন্ত ! দেখবে , মেয়ে তোমারই থাকবে। গুম হয়ে রইলেন অঞ্জন। মেয়েটা চলেই যাবে তবে ! আর কিছু করা গেল না। দেখ ! কেমন বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে আছে মর্কটটা ! দেখেই গা জ্বলে যায় একেবারে ! কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে, মর্কট কোথাকার ! বীথির আদিখ্যেতা দেখলেও রাগ ধরে খুব। আহা রে ! মা বাবা নেই ছেলেটার । একা একা থাকে। একটু ভালো মন্দ রান্না করে খাওয়াই ওকে ! এই সব অজুহাতে নানা রকমের রান্না করে বীথি , আর আহাম্মকটা দাঁত কেলিয়ে কেলিয়ে গাণ্ডেপিণ্ডে গেলে। পেটুক কোথাকার ! অঙ্কনা অব্দি আরও খাও , আরও খাও করতে করতে আহ্লাদে গলে পড়ছে একেবারে ! মা মেয়েতে মিলে কি যে শুরু করেছে ! অঞ্জন যে কোথায় যান ! যতবার তাঁর মনে হচ্ছে , এই ছেলেটার কারণেই অঙ্কনাকে চলে যেতে হবে , ততই রাগ হচ্ছে তাঁর । বেটা বহুত ত্যাঁদড় পাবলিক। বুদ্ধি করে অঞ্জন বলেছিলেন , মা বাবা যখন নেই , বিয়ের পরে ইচ্ছে হলে এখানেই থাকতে পারে সে। কিন্তু ব্যাটা মাছি তাড়ানোর মত করে উড়িয়ে দিল অঞ্জনের প্রস্তাব। সে ঘরজামাই হতে চায় না। এইটুকু মুখে না বললেও আকারে ইঙ্গিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে ভালো করে।ব্যাটা বদমাশ ! পঁচিশ বছর ধরে তিলে তিলে শরীরের রক্তবিন্দু দিয়ে যাকে বড় করে তুলেছেন , তাকে নিয়ে চলে যাবে দুদিনের এই ছোঁড়া ! উফ ! কি বিচ্ছিরি ব্যাপার ! রাগ হলেও ব্যাপারটা হজম করতে হবে তাঁকে ।

অঞ্জনের যতই অনিচ্ছে থাক , অঙ্কনা আর কিঞ্জলের বিয়ে হয়েই গেল শেষ পর্যন্ত। কিঞ্জল যখন অঙ্কনাকে নিয়ে গাড়িতে উঠলো চলে যাবে বলে , বুকটা যেন খালি হয়ে গেল অঞ্জনের। এই শূন্য বাড়িতে এখন শ্বাস নেবেন কি করে ! নিজেকে সামলাতে না পেরে বলেই ফেললেন ,কিঞ্জল ! মেয়েটাকে একটু দেখে রেখো ! ও ছাড়া যে আর কেউ নেই আমাদের ! ওর জন্মের পর থেকে ওকে ঘিরেই বেঁচে থেকেছি আমরা। জানি না , এখন কি করব আমরা ! ”কি ছিল অঞ্জনের গলায় যে , কিঞ্জল কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে। তারপর বলল ভাববেন না ! আমিও আজীবন অঙ্কনাকে ঘিরেই বেঁচে থাকব। তাই অঙ্কনা যাতে ভালো থাকে , সেদিকে যথেষ্ট খেয়াল রাখব আমি। ” চলে গেল কিঞ্জল অঙ্কনাকে নিয়ে। খালি করে দিয়ে গেল অঞ্জনের বুক। বীথিরও দেখেছ ! অঙ্কনা কতদিন ধরে আসছেই না ! ওর কাছে এখন কিঞ্জলই সব। আমরা কেউ নই ! ”কি ছেলেমানুষি করছ ? নতুন বিয়ে হয়েছে , এখন একটু ওদিকে মন থাকবেই। নিজে বিয়ের পর কি করতে , ভুলে গিয়েছ সব কিছু , তাই না ! চুপ করে থাকেন অঞ্জন। মনে পড়ে , ছোটবেলায় অঞ্জনের কি ন্যাওটা ছিল মেয়েটা । যেখানেই থাক , বাবাকে ওর চাইই ! এই মেয়ের জন্যেই এক রাতও বাপের বাড়িতে থাকতে পারত না বীথি । আর আজ ! দিব্যি বাবাকে ভুলে গিয়ে আরেকটা ছেলের সাথে সুখে আছে অঙ্কনা ।  একটা সময়ে বাচ্চাদের হাত ছেড়ে দিতেই হয় , জানো না ! কতদিন হাত ধরে রাখবে আর ! বীথির কথায় ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকালেন অঞ্জন, জবাব দিলেন না কিছু।কিছুদিন পর এক রাতে অঙ্কনা এসে হাজির। গম্ভীর , থমথমে চেহারা, দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো ঝগড়া করে এসেছে। বীথি হাউ মাউ করে উঠলো মেয়েকে এই অবস্থায় দেখে। অঙ্কনা বিরক্ত গলায় বলল ,

” কি শুরু করেছ মা ! এখানে থাকতে আসতে পারি না আমি ! অঞ্জন মনে মনে একটু খুশীই হচ্ছিলেন মেয়েকে কাছে পেয়ে। কিন্তু রাগও হচ্ছিল কিঞ্জলের ওপর । এর নাম অঙ্কনাকে ভালো রাখছে ও ! সেই মুহূর্তে মেয়েকে আর ঘাঁটালেন না অঞ্জন। পরে জানা যাবে ব্যাপার কি । পরদিন ভোরবেলা বেল বেজে উঠলো দরজার। অঙ্কনা আর বীথি ঘুমুচ্ছে এখনও । অঞ্জন গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। কিঞ্জল দাঁড়িয়ে আছে বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে। অঞ্জনকে দেখেই বলল অঙ্কনা কোথায় ? কি রাগ আপনার মেয়ের ! দুম করে চলে এল কাল । ভোরবেলাই ছুটতে ছুটতে এলাম তাই। ” মনে মনে অঞ্জন বললেন , ” বেশ করেছে ! ” মুখে বললেন , কি হয়েছিল ? ” ততক্ষণে ভেতরে ঢুকে সোফায় আরাম করে বসে পড়েছে কিঞ্জল।  আর বলবেন না ! ও বলেছিল , আপনাদের নিজের কাছে নিয়ে রাখবে । কারণ ও ছাড়া আর কেউ নেই আপনাদের। তাতে আমি শুধু বলেছিলাম , আপনারা মানবেন না কিছুতেই। কোনো মা বাবাই এমন মানেন না। তাতেই ও রেগে গিয়ে বলল , কেন মানবেন না ? মা বাবা যদি ছেলের কাছে থাকতে পারে , তবে মেয়ের কাছে নয় কেন ? আমি নাকি আপনাদের নিয়ে থাকতে চাই না বলেই বাহানা বানাচ্ছি। আমি খুব খারাপ , এসব আরও কত কি বলে হুট করে চলে এল এখানে। কি ছেলেমানুষ , বলুন তো দেখি ! অঙ্কনা এমন বলেছে জেনে বুক ভরে যাচ্ছিলো অঞ্জনের।মেয়ে তাঁদেরই রয়ে গেছে তবে এখনো ! তবে সত্যিই কি তাঁরা কিঞ্জলের বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারবেন ? এই মুহূর্তে তো নয় অঞ্জনকে চুপ দেখে কিঞ্জল আবার বলল , বলুন তো , এটা কি সম্ভব ? কোনো মা বাবা কি জামাইয়ের বাড়িতে থাকতে যান! এতে তাঁদের সম্মান হানি হয় না ! তা অঙ্কনা কিছু বুঝলে তবে তো ! এবারে একটু একটু রাগ ধরছিল অঞ্জনের। এই ছেলে ব্যাপারটা অসম্ভব ভাবছে কেন ? মেয়ের সঙ্গে থাকাই তো যায় ! কিঞ্জল তখনও বলে চলেছে  কবে যে অঙ্কনা বুঝতে শিখবে ! জামাইয়ের বাড়িতে যে কোনো শ্বশুর শাশুড়িই থাকতে চান না , থাকাটা সম্ভবও না , সেটাই ওর মাথায় ঢুকছে না। আমাদের সমাজের নিয়ম এটা , একে উপেক্ষা করব কি করে ! ” হঠাত হুঙ্কার দিয়ে ওঠেন অঞ্জন ,” বার বার জামাইয়ের বাড়ি , জামাইয়ের বাড়ি করছ কেন হে ! ওইটা আমার মেয়েরও বাড়ি , বুঝলে ! আর মেয়ের বাড়িতে যখন খুশী আমরা গিয়ে থাকতেই পারি ! পারলে আজীবন থাকতে পারি। তুমি বলার কে হে ! ”তাহলে চল বাবা ! ” অঙ্কনার মুখে হাসি । অঙ্কনার গলা পেয়ে চমকে পেছনে তাকালেন অঞ্জন।সে কখন উঠে এসেছে , জানতেই পারেন নি । কিঞ্জল হেসে ফেলল এবার। বলল ,অঙ্কনা বলেছিল , আমায় আপনি পছন্দ করেন না। তাই আমি যা বলব , তার উল্টোটাই ভাববেন আপনি। আমি আপনাদের নিয়ে যেতে চাইলে কখনও রাজী হবেন না । তাই আমাকে এর উল্টোটা বলতে হল। ”

হতভম্ব অঞ্জন। কিছুই মাথায় ঢুকছে না । হেসে ফেলল অঙ্কনাও । বলল , আগে থেকে এভাবে প্ল্যান করেই এখানে এসেছি বাবা ! কেন তুমি আর মা এখানে একা একা থাকবে ! আমরা একসাথে থাকি , আগের মত , চল না বাবা! অঞ্জনের লোভ হচ্ছে। থাকাই তো যায় মেয়ের সাথে ! আজ অঙ্কনা ছেলে হলে ওর বাড়িতে থাকতে যাবার আগে এত ভাবতেন না তিনি। তবে মেয়ে বলেই এত ভাবতে হবে কেন ? তিনি যাবেন অঙ্কনার সাথে। ওর বাড়িতে থাকবেন বলে ।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


52 views